[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



জাবির হলে থেকে মেয়েরা নষ্ট হয় নাকি চেতনার বিকাশ ঘটে?


প্রকাশিত: October 19, 2016 , 1:14 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট,পাবলিক ইউনিভার্সিটি


Ila-Fahmi-live

ফাহমি ইলা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম দর্শনের সুযোগ হয় ২০০৬ এ। তখন আমি এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কোথাও ঘুরতে যাবার প্ল্যান করে বন্ধুদের একটা বিশাল গ্রুপসমেত আমরা জাহাঙ্গীরনগর চলে গিয়েছিলাম। স্পষ্ট মনে আছে জাহাঙ্গীরনগরের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মোহিত করেছিলো! ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠার কারণে এতো সবুজ, পদ্মভর্তি লেক, শীতের পাখি দেখে পুরো পরিবেশটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কেবলই মনে হয়েছিলো-‘এত সুন্দর এর আগে আমি কোথাও দেখিনি’।

দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম ঠিক পরের বছর ভর্তি পরীক্ষা দেবার জন্য। আরো দু’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হওয়ার পরও জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হই (বা আমাকে ভর্তি করানো হয়)। কারণ বাকি দুটোর রেজাল্ট দিতে দেরি হয়েছিলো। তাছাড়া আমার মনের ভেতর সেই কলেজ জীবনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছবি আঁকা হয়েছিলো সেখান থেকেই জাবি (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ) ছিলো আমার প্রথম পছন্দ।

আমার পরিবার যখন সিদ্ধান্ত নিল আমাকে জাবিতে ভর্তি করাবে তখন তাদের শর্ত একটাই ছিলো- আমাকে ঢাকা থেকে নিয়মিত ক্লাস করতে হবে, কারণ হলের মেয়েরা নাকি ভালো হয় না। আমার কাজিন জাবি’র শিক্ষক হবার সুবাদে তাকে বলে পরিবারকে রাজি করানো হয় আমাকে হলে সিট নেবার জন্য, কারণ সবসময় ঢাকা থেকে গিয়ে ক্লাস করা সম্ভব ছিলো না। আমাকে যেদিন বাক্স-প্যাটরাসমেত হলে দিয়ে যাওয়া হয়, বিধিনিষেধের একটা বিশাল লিস্টিও ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

যেমন- পড়াশোনা মন দিয়ে করা, আড্ডাবাজি না করা, সন্ধ্যের আগে হলে ঢোকা, হলের ক্যান্টিন বা ডাইনিংয়ে খাওয়া-দাওয়া করা, রাত জেগে মেয়েদের সাথে বেশি আড্ডা না দেয়া, ছেলেদের সাথে বেশি না মেশা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বাড়াবাড়ি রকমের জেদি মেয়ে ছিলাম, সেটা আমার বাবা-মা খুব ভালোভাবে জানতেন। ফলে যেটা হলো, আমি হলেই বেশি থাকা শুরু করলাম। কারণ হলের মেয়েদের ব্যাপারে যেসব কথা আমাকে বলা হয়েছিলো, তা ক’দিনের মধ্যেই আমার কাছে মিথ্যে প্রমাণিত হলো।

এদিকে যেসব আত্মীয়-স্বজন সারাজীবনে কখনো খোঁজও নেয়নি, তারাও আম্মাকে ফোন দিয়ে বলতে লাগলেন-‘জেসমিন, এত বড় ভুল তুমি কীভাবে করলে! মেয়েকে হলে থাকতে দিলে? ও তো নষ্ট হয়ে যাবে!’ আম্মা আমাকে প্রায়ই তাগাদা দিতেন বাসায় আসার জন্য। আর আমি একমাত্র বৃহস্পতি কিংবা শুক্রবার ছাড়া বাসায় আসতাম না। কারণ হল লাইফ, ক্যাম্পাস লাইফে আমি সম্পূর্ণ মজে গিয়েছিলাম। ফলে মাসখানেক পরে আমাকে শায়েস্তা করবার জন্য টাকা পাঠানো বন্ধ করা হলো।

আব্বা বললেন- ‘দুদিন পর পর টাকা নিয়ে যাবে, মাসের টাকা তোমাকে একবারে দেয়া হবে না। কারণ টাকা দিলেই তুমি আর আসছো না।’ আমার মনে আছে আমি ছ’মাসের মাথায় টিউশনি ম্যানেজ করি এবং দেড় বছরের মাথায় পার্টটাইম জব। এটা ছিলো একধরনের নীরব প্রতিবাদ। তারা ধরেই নিয়েছিলেন যেহেতু তাদের ওপর আমার আর্থিকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে সেহেতু তাদের দেয়া বিধিনিষেধের ঝুলি কাঁধে তুলে আমি ‘ভালো মেয়ে’ হয়েই থাকবো, কারণ ‘হলের মেয়ে’ হলে ভালো বংশে বিয়ে হবে না।

আব্বাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম-‘আমি বিয়ের জন্য পড়াশোনা করছি না।’ এরপর তাদের সাথে আমার সম্পর্ক কিছুটা শীতল হলেও, কিছুদিনের মাঝে তারা মেনে নিতে বাধ্য হোন। আমার মাকে আমি তথাকথিত টিপিক্যাল নারীর চেয়ে কিছুটা আধুনিক মানসিকতার দেখে এসেছি সবসময়। কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক চাপে মা সবসময় নিজের ইচ্ছেগুলোকে প্রকাশ করতে পারতেন না। আমার মনে হয়েছিলো আমার এ সিদ্ধান্তে মা কিছুটা খুশিই হয়েছিলেন কারণ তিনি আজীবন চেয়েছেন তার কন্যাসন্তানেরা নিজের পায়ে দাঁড়াক, সমাজে তাদের একটা অবস্থান তৈরি হোক।

ju-live98

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর দু’মাসের মাথায় আমি থিয়েটারে যোগ দেই। স্কুল-কলেজে যে মেয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষার আগে বই নিয়ে বসতো, তার নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকবার কোন কারণ ছিলো না। তখন একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আন্দোলন চলছিলো। সবার সাথে আন্দোলনে যোগ দিলাম স্বাচ্ছন্দে। এরপর ক্যাম্পাসে যতগুলো যৌননিপীড়নবিরোধী, ভিসিবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, সবগুলোতেই সামিল থাকার চেষ্টা করেছিলাম।

না, আমি কোন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে সংযুক্ত ছিলাম না। কারণ আমার মনেপ্রাণে ছিলো নাটক, থিয়েটার। কিন্তু প্রতিবাদ করতে হলে কোন সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকতেই হবে এ কথা আমি মানতে নারাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। এছাড়াও হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান, দাম বৃদ্ধি, সিট বরাদ্দ, ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়েও আমরা কম আন্দোলন করিনি।

প্রশ্ন হলো– বাসা থেকে রেগুলার শুধু ক্লাসের জন্য ক্যাম্পাসে গেলে এগুলো করতে পারতাম? এগুলো বাদ দিয়েও ক্লাস করা, ক্লাস শেষে দলবেঁধে বটতলায় খাওয়া শেষে আড্ডা দেয়া, বিকেলে থিয়েটার করা, মেহেরচত্বর টারজানে আড্ডা দেয়া, সন্ধ্যায় লেকের পাড়ে বসে গিটার নিয়ে গলা ছেড়ে গান গাওয়া, উৎসবের সময় রাত জেগে রোড পেইন্টিং করা- এসব করা যেত? বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন একটা মানুষের মানসিকতাকে কীভাবে পূর্ণরূপ দান করে আমি এর বড় সাক্ষী এবং এ ব্যাপারে আমার সাথে হলে থাকে, এমন শিক্ষার্থীরাও একমত হবেন আশা করি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা বিভিন্ন সাব-কালচারের ছেলেমেয়েদের সাথে মিশে, তাদের ধ্যান-ধারণার সাথে পরিচিত হয়ে শহুরে আমি যে কীভাবে আমূল পাল্টে গেলাম তা আজ ভাবলে নিজের সেই জিদ, বাবা-মার সাথে প্রতিবাদের প্রতি নিজেই কৃতজ্ঞ হই।

নিজের জীবনের কথা বলবার সাথে সাথে জাবির মেয়েদের সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চাইছিলাম।

অনেক মেয়ে আছে যারা ক্লাস-হল-পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না, আবার অনেক মেয়ে আছে যারা রাজনীতি করছে সংগঠন করছে, অনেকে প্রেম করে বিয়ে করে সংসার পেতেছে। কথা হচ্ছে জাবি’র মেয়েরা কোন দিক দিয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের থেকে আলাদা? এদের নিয়ে এতো প্রশ্ন কেনো? এতো কানাঘুষা কেনো? অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলজীবন কি কাছাকাছি বা একইরকম নয়?

আমার ধারণা- খুব কাছেই রাজধানী থাকা সত্ত্বেও গাছগাছালী ভরপুর (কারো কাছে জঙ্গল) মফস্বলের মতো একটা জায়গায় একটা মেয়ে অভিভাবক ছাড়া থাকছে এটাই চোখে লাগার মতো বিষয়। তারওপর সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হবার কারণে হুটহাট বাইরের মানুষ এখানে ঢুকে পড়তে পারে না, চাইলেই খোঁজখবর পায় না। এজন্যই তাদের মনে সারাক্ষণ একটা প্রশ্ন-‘কী হয় আসলে এই বাউন্ডারির ভেতরে?’

সমরেশ মজুমদারের একটা বইতে পড়েছিলাম যে, কলকাতায় সত্তরের দশকে অনার্স পড়তে আসা মেয়েদের মাঝে যারা হোস্টেলে থাকতো, তাদেরকে বাড়ি থেকে পড়তে আসা মেয়েরা নাকি এড়িয়ে চলতো। কারণ তখন হোস্টেলের মেয়েদের সম্পর্কে বাজে ধারণা কাজ করতো।

২০১৬ সালে এসে কি সেই ধারণা খুব পাল্টে গেছে?

অনেকে বলেন- ‘জাবিতে হরদম যৌন নিপীড়ন, লাঞ্ছনার খবর পাওয়া যায়, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তো পাওয়া যায় না।‘ প্রশ্ন হলো- কিভাবে পাওয়া যায়? যে লাঞ্ছিত হচ্ছে সে যদি মুখ না খোলে তাহলে পাওয়া যেত? তার মানে নিপীড়িত হয়ে, লাঞ্ছিত হয়ে জাবির মেয়েরা প্রতিবাদ করে এসেছে, করছে। আর করছে বলে সারাদেশে খবর ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। সেজন্য জাবি’র মেয়েদের গায়েই ট্যাগটা লেগে যাচ্ছে!

এখন যদি লাঞ্ছিত হয়ে কোনো মেয়ে চুপ থাকতো তাহলে তো কেউ জানতো না, খবরও বেরুতো না। তখন জাবি’র মেয়েরা ভালো – সুবোধ – সতী থাকতো!! তাছাড়া হলে থাকা মেয়েরা যে স্বাধীনতাটুকু ভোগ করে সেটাও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পুরুষদের মেনে নেবার কথা নয়। স্বাধীনতা তো শুধু ছেলেদের জন্য, মেয়েরা যতটুকু ভোগ করবে, ততটুকুতে তার মাথায় একজন পুরুষের ছায়া না থাকলে সে নষ্ট হয়ে যাবে। নষ্ট মেয়েরাই হয়, ছেলেরা কখনো নষ্ট হয় না কারণ তাদের সাথে সতীত্ব বা যৌনতার ট্যাগ সিল মেরে লাগানো নেই।

এখনো হলে থাকা মেয়েদের নিয়ে নানারকম গুজব শিক্ষিত অশিক্ষিত মহলে ছড়িয়ে আছে। আমার এক বন্ধু আড্ডার ছলে চট করে বলে ফেলেছিলো-‘কিরে মেয়েদের হলে খাটের নিচে নাকি বেগুন, শসা প্রচুর পাওয়া যায়?’ তৎক্ষণাৎ রাগ চেপে আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম-‘তোদের তো ওসবের প্রয়োজন হয় না কারণ তোদের হাত আছে!’

ব্যস! আশপাশের মেয়েরা লালে লাল হয়ে উঠে গেলো, আর ছেলেগুলো এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যে, এই প্রথম তারা কোন ভিনগ্রহের এলিয়েনকে দেখছে। আমার কথা হলো, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সত্য নয় এবং আমি নিজেই কখনো চোখে দেখিনি সেটা নিয়ে আমাকে ঘায়েল করতে এলে আমি হুজুর হুজুর করে সাফাই গাইবো কেনো, সত্য-মিথ্যার ব্যাখ্যাই দিতে যাবো কেনো?

কেউ কেউ নারীর যৌনতা নিয়ে কথা বলে স্রেফ একধরনের শিশ্নসুখ পায়। আমার উত্তর, তাদের পছন্দ না হলেও পরবর্তীতে আমাকে নিয়ে বিস্তর নেতিবাচক আলোচনা হয়েছিলো শুনেছিলাম। অবশ্য তাতে আমার জীবনের এক চুল পরিমাণ কোন ক্ষতি হয়নি, বরং এরপর থেকে তারা কথা বলতে গেলে সাবধানে বলতো।

বেশিরভাগের ধারণা- বেশি স্বাধীনতায় নাকি মেয়েরা নষ্ট হয়ে যায়। বেশি স্বাধীনতায় ছেলেরা নষ্ট হয় না? যে ছেলেটা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে থাকে, পড়াশোনা না করে সারাদিন আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, সে কোনোভাবে নষ্টের কাতারে পড়ে না? অবশ্য ‘নষ্ট’ শব্দটা নারী আর পুরুষের ক্ষেত্রে একইভাবে ব্যবহৃত হয় না। এটা পুরুষের চরিত্রের সাথে আর নারীর যৌনতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় এক অভিভাবক তার ছেলের বৌ হিসেবে আমাকে পছন্দ করেছিলেন। আমার সম্পর্কে জানতে গিয়ে যখন শুনলেন, হলে থাকি, তখন আর আমার আব্বা-আম্মার সাথে কথা বলতে চাননি। তিনি বলেছিলেন- ‘হলে থাকো কেনো মা? হলে থাকলে নাকি নষ্ট হয়ে যায় সবাই।’

উত্তর দিয়েছিলাম-‘আপনার ছেলেটিকেও হল থেকে বাসায় নিয়ে আসুন। সেও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ বোঝাই যায়, হলে এসে মেয়েরা যে স্বাধীনতাটুকু ভোগ করে সেটা এ সমাজ মেনে নিতে চায় না। মেয়েদের জন্মই হয়েছে বিয়ে করে পরের বাড়ি চলে যাবার জন্য, সে যতই লেখাপড়া করুক।

আহা, কত সুন্দর মানসিকতা নিয়ে আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বসে আছি! আর নারীরাও সবাই যে এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসেছে তা বলব না। হাজার বছরের পুরুষের দাসত্বের যে কুজ পিঠে তৈরী হয়েছে তা ঝেড়ে ফেলে মেরুদণ্ড সোজা হয়ে দাঁড়াতে যথেষ্ট ধৈর্য, সাহস, শাণিত কণ্ঠ, প্রতিবাদ করবার মানসিকতা থাকা দরকার।

ju-livr3

হলে যেসব মেয়েরা থাকে তাদেরকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কেউ পড়াশোনায় ব্যস্ত, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন করছে, কেউ পড়াশোনা বাদে আড্ডা দিতেই ভালোবাসে। রাতে যখন হলের গেইট বন্ধ হয়ে যায় তখন বিভিন্ন রুমের মেয়েরা একসাথে হয়ে আড্ডার আসর বসায়, পিকনিক করে।

কতদিন ভোরে বেরিয়ে হলের পেছনের পাঁচিল বেয়ে ছাদে উঠে আম, কাঁঠাল, জলপাই, কামরাঙ্গা, চালতা, আমড়া পেড়েছি। হুটহাট হলসুপারের সামনে পড়ে গেলে তার রাগিচোখের সামনে মুখ হাসি হাসি করে দু’তিনটে জলপাই হাতে গুঁজে দিয়ে চলে আসতাম। কিংবা বড়শি নিয়ে হুটহাট মাছ ধরতে চলে যেতাম, সেই মাছ দিয়ে রাতে হতো বারবিকিউ পার্টি। ছেলেবন্ধুরা হলের গেইটে এসে বসে থাকতো, আমরা রান্না শেষে বাটি ভরে তাদের দিয়ে দিতাম। আবার কারো জন্মদিন থাকলে মেয়েদের হলের বাগানে ফুল না থাকলে ছেলেদের হলের সামনে গিয়ে ফোন দিতাম, তারা তাদের বাগান থেকে ফুল ছিঁড়ে দিলে তা দিয়ে রাতে বান্ধবীটিকে চমকে দিতাম। এইতো সুখের হললাইফের চিত্র।

জাবিয়ান মেয়েদের নিয়ে যত কানাঘুষা তা যদি নিরক্ষর, অর্ধশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মানুষেরা করতো তাহলেও একটা কথা ছিলো, শিক্ষিত প্রগতিশীল মানুষদেরও এ নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। নারীর যৌনতার বিষয়ে এক কাতারে আসতে হয় না এদের, অটোম্যাটিক এসে যায়।

এদের যদি প্রশ্ন করা হয়-‘ক’জন জাবি’র মেয়েকে দেখেছেন?’

হয়তো বলবে-‘একটা দু’টো’ কিংবা বলবে-‘দেখিনি, শুনেছি’।

জাবি’রই এক তথাকথিত ভদ্র ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো-‘ বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবছো?’ সে সরাসরি উত্তর দিয়েছিলো-‘জাবি’র মেয়ে বাদ দিয়ে মেয়ে খুঁজছি’। এই ভদ্র(!)ছেলেটি দু দু’টো প্রেম করেছিলেন, টেকেনি। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম-‘জাবির মেয়েরা খারাপ হয়, কারণ বাপ-মা ছাড়া থাকে, অবাধ স্বাধীনতায় থাকে, প্রেম-ফ্রেম করে বসে। এজন্য সতী সাবিত্রী মেয়ে খুঁজছেন যে কিনা আপনাকে ছাড়া কাউকে ছুঁয়েও দেখেনি। আপনি নিজে তো দু’টো প্রেম করেছেন, ছুঁয়েছেনও বটে। নিজেতো নষ্ট হয়েছেনই, সেইসাথে দু’টো মেয়েকেও নষ্ট করেছেন আপনি?’ ছেলেটি এরপর আমাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে গেছে বাকি ক্যাম্পাস লাইফ।

শুনেছি তিনি বাবা-মায়ের পছন্দে সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা এক কিশোরীকে বিয়ে করেছেন। এইতো ভালো মেয়ের সংজ্ঞা! যার গায়ে পুরুষের হাত পড়েনি, যে এখনো স্বাধীনতার মানে বুঝতে শেখেনি, যাকে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে গড়ে নেয়া যায়, যে শাসনে মাথা নুইয়ে রাখে, শোষণে মুখ বুজে থাকে, আর ভোগের বেলায় চুপচাপ চোখ বুজে পড়ে থাকে। কিন্তু এই মেয়েই যদি কখনো প্রশ্ন তোলে তার নিজ অধিকারের ব্যাপারে, তাহলে সে হয়ে উঠবে সাক্ষাত মুখে বুলি ফোটা নষ্ট মেয়ে।

ভালো মেয়ের সংজ্ঞাটা আজো কি কারো কাছে ক্লিয়ার? এটা বড্ড আপেক্ষিক, মানুষ আর তার মানসিকতার প্রেক্ষিতে। ভালো মেয়ে মানে যে বাবা-মা কিংবা স্বামীর কথা মানে, সবকিছু মানিয়ে নিতে পারে, উঁচু গলায় প্রতিবাদ না করে নীরবে সয়ে যায়, রাস্তাঘাটে লাঞ্ছিত হলেও চিৎকার চেঁচামেচি করে না, পুরুষের লাঞ্ছনা অত্যাচার মেনে নেয় নিজ নিয়তি মনে করে, যে নিজেকে আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত করে, সংসার সন্তানের জন্য জীবনকে বেচে দেয় এবং আরো অনেক কিছু। পুরুষের এই তৈরীকৃত বলয় থেকে যারা বেরোয় বা বেরিয়ে আসতে চায় তারাই খারাপ, নষ্ট মেয়ে বলে বিবেচিত হয়।

 

যারা জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষিত মেয়েদের নিয়ে কটাক্ষ করেন তারা কি জানেন আপনাদেরকে অনুকম্পা দেখাবার মত সময়টুকুও আমাদের হাতে নেই! আপনাদের কথা শুনে স্রেফ আমরা আপনাদের উদ্দেশ্যে করুণার হাসি দেই। এই সেই জাহাঙ্গীরনগর যেখানে দেশের প্রথম যৌননিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ধর্ষক জসিমউদ্দিন মানিকের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশে প্রথম যৌননিপীড়নবিরোধী নীতিমালা তৈরী হয় এখান থেকেই। এইতো বছর তিনেক আগে এক নারীশিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানির প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলো পুরো ক্যাম্পাস। শুধুমাত্র দু’হাজার মেয়ে নিয়েই একটা মিছিল হয়েছিলো। যেই মিছিল দেখে ভয়ে অপরাধীর হলের গেইট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো নতুবা সেদিন হলে ঢুকে তাকে টেনে রাস্তায় নামাতাম আমরা। এত মেয়ের একসাথে মিছিল দেখে প্রশাসন পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো। আমরা শিক্ষক নিপীড়নের বিরুদ্ধে মাথা তুলে প্রতিবাদ করেছি, সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি- যাকে শ্লীলতাহানি করা হয় লজ্জ্বা তার নয়, বরং অপরাধ সেই পুরুষের। আর পুরুষের বিরুদ্ধে এই গলা উঁচু করে প্রতিবাদটাই বোধহয় তথাকথিত ‘আপনারা’ মেনে নিতে পারেন না। কারণ নারী হবে কোমল, নরম, লতিকালতা। হাসবে নীরবে, কাঁদবে নীরবে, সহ্যও করবে নীরবে। তার গলা উঁচুতে ওঠা মানে ‘আপনাদের মুখোশটা খসে পড়ে যাওয়া।

যারা জাবির মেয়েদের নিয়ে, হলের মেয়েদের নিয়ে হাজার রকমের কানাঘুষা, কুৎসা রটান তাদেরকে বলি- নিজেকে একবার প্রশ্ন করেছেন এইসব স্বাবলম্বী প্রতিবাদমুখর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা মেয়েদের আপনি যোগ্য কিনা? জাবির মেয়েদের নিয়ে যত কানাঘুষাই হোক না কেনো ভাই, এরা কিন্তু শিক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বসে নেই। বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকুরী করছে, নিজেকে স্বাবলম্বী করছে, এমনকি অবিবাহিত হয়ে জীবন পার করছে না। আপনার চেয়েও যোগ্য কাউকে খুঁজে নিয়ে সুন্দর সুখে আছে তারা।

তাহলে এতো যে কথা বলেন সেগুলো কি স্রেফ নারীকে ওপরে উঠতে দেখে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে? নাকি অধঃস্তন করে রাখতে পারলেন না বলেই নারীর স্বাধীনতা ভোগ করতে দেখে নিজের পুরুষালী মনস্তাত্ত্বিক হাতমুখ নিশপিশ করে? নারী আপনার সমানে পৌঁছেছে বা এক ধাপ ওপরে উঠেছে, তার সাথে চোখ তুলে কথা বলতে গেলে হাজার বছরের লালিত কোনো একটা জায়গায় যেনো বাড়ি লাগে, তাই না?

থাকুন আপনারা আমাদের নিয়ে মুখর হয়ে। এতে আমাদের মেয়েদের কিচ্ছু আসবে যাবে না। আপনারা নন, আমরাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

[কার্টেসি : উইমেন চ্যাপ্টার]

ঢাকা, ১৯ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন