[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



মেধাবীরাই হোক শিক্ষক


প্রকাশিত: October 30, 2016 , 10:33 pm | বিভাগ: আপডেট,ক্যাম্পাস,গেস্ট কলাম


akm-shah-newaz1

একেএম শাহনাওয়াজ: এখন দেশে এ সত্যটি অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি হয় তিন উপায়ে- এক. জোর তদ্বিরে, দুই. অর্থ বাণিজ্যে এবং তিন. এ দুই মিলে কখনও কখনও নতুন শব্দ তৈরি হয়- ‘দলীয় বিবেচনায়’। তাহলে মেধা-যোগ্যতার কোনো জায়গা রইল না। যে কোনো উপায় অবলম্বন করে যারা কামিয়াব হন, তাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। তারা সবাই এ দেশের সন্তান।

চাকরি পাওয়ার অধিকার ও প্রয়োজন তাদের সবারই রয়েছে। কিন্তু আমার কষ্ট ও সহানুভূতি সেই চাকরিপ্রার্থীদের জন্য যারা ছাত্রজীবনে নিবিষ্ট মনে মেধা চর্চা করেছেন, নিজেদের যোগ্য করে তুলেছেন, জীবনের উঠোনে সোনালি স্বপ্নের ফসল ফলবে বলে আশায় বুক বেঁধেছেন, অথচ ভাবতে পারেননি সে আশা বারবার ভেঙে চুরমার হবে। ভাবতে পারেননি তাদের অনেক যোগ্যতার পরও কিছু ‘অযোগ্যতা’ ছিল।

যেমন ছাত্র থাকতে তারা রাজনীতিতে যুক্ত থাকেননি। আর রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও চাকরি প্রার্থনার সময় যে দল ক্ষমতায় সে দলের রাজনীতি করেননি। তাদের আরেকটি ‘অযোগ্যতা’ চাকরি পাওয়ার জন্য টাকা খরচ করার সামর্থ্য বা মানসিকতা নেই। আর সবশেষ ‘অযোগ্যতা’ ডাকসাইটে কোনো মুরুব্বি নেই যারা তদ্বির করতে পারেন। যোগফলে মেধার পরাজয় ও তদ্বিরের জয়ধ্বনি এখন সর্বত্র শোনা যাচ্ছে।

আমার এক মেধাবী ছাত্রের কথা বলি। এমন চৌকস ছাত্র মাঝে মধ্যে মেলে। স্বাভাবিকভাবেই ওর স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। আমিও ভাবতাম এমন মেধাবী ছেলেমেয়েদেরই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রায় তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছে। ওর লেখা গ্রন্থ ও গবেষণা প্রবন্ধের তালিকা চোখকাড়ার মতো। তিন বছর ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞাপন দেখে ছুটে যাচ্ছে। ফলাফল শূন্য। সার্টিফিকেটে আর গবেষণায় ঝকঝকে হলেও তদ্বির আর অর্থ যোগ্যতা ওর মোটেও নেই। তাই স্বপ্নভঙ্গ হওয়া ছাড়া ওর ভাগ্যে আর কিছু থাকছে না।

একই বাস্তবতায় আমার এক মেধাবী ছাত্রী একবার আমাকেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। আমি ক্লাসে বলি, শিক্ষার্থীরা সবাই অলিখিত চুক্তিতে ঋণী হয়ে আছে এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে। একজন শিক্ষার্থীকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রেখে পড়াতে পরিবারের কম করে হলেও মাসে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। ওর পেছনে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ হচ্ছে আরও পনেরো হাজার টাকা। রাষ্ট্র এই পনেরো হাজার টাকা দেয় জনগণের দেয়া ট্যাক্স থেকে। যে মানুষটির সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারছে না, তার সঙ্গে অলিখিত চুক্তি থাকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলবে শিক্ষার্থী। তারপর পেশাজীবনে এসে গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসবে। দেশের সেবা করে এই ঋণ শোধ করবে সে।

ছাত্রীটি বলল, আমি আপনার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। ঋণ শোধ করার জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ঋণ শোধ করার সুযোগ তো পাচ্ছি না। স্যার, এসব এখন স্রেফ নীতিকথায় আটকে থাকছে। একদিন একটি ছোট্ট আবদার নিয়ে এলো ছাত্রীটি। বলল, স্যার, আমরা জানি আপনি তদ্বির করা পছন্দ করেন না। আমার নিজেরও পছন্দ নয়। আমি অমুক বিভাগে প্রভাষক পদের জন্য আবেদন করেছি। শুনেছি কোথাও না বললে নাকি কিছু হয় না। আমি আপনাকে আমার জন্য তদ্বির করতে বলব না।

আপনি যদি এটুকু বলেন যাতে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হয়। সে বিচারে আমি নির্বাচিত না হলেও দুঃখ থাকবে না। ওর আবদারটি আমাকে ছুঁয়ে গেল। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তখন শিক্ষক রাজনীতির একজন ডাকসাইটে নেতা। প্রশাসনের পক্ষের মানুষ। ওরা চাইলে রাতকে দিন করতে পারে। আমি ছাত্রীটির জন্য তার ইচ্ছে অনুযায়ী ‘তদ্বির’ করলাম। বললাম, ও মেধাবী, ভালো ফলাফল করা মেয়ে। ও যাতে নিরপেক্ষ বিবেচনাটি পায়। বন্ধুর সরল উক্তি আমাকে বিস্মিত করল। ও একবারের জন্যও ছাত্রীটির একাডেমিক যোগ্যতার কথা জিজ্ঞেস করল না। একটিই মাত্র প্রশ্ন ছিল- ছাত্র থাকতে ‘আমাদের রাজনীতি’ করত কিনা? কথা না বাড়িয়ে নীরবে নিজেকে রক্ষা করলাম।

কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আমার বন্ধুস্থানীয়। ভালো ফলাফল করা এক ছাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণে বারবার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছিল। আমার বিশ্বাস, স্নাতক-স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফল ও গবেষণা প্রকাশনার বিচারে ছাত্রটি এক-দুই নম্বরে থাকবে। আমার খুব খারাপ লাগছিল বলে একবার প্রভাষক পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগে উপাচার্য মহোদয়কে ফোন করলাম।

বললাম, সবদিক মিলিয়ে ছেলেটি যদি যোগ্য হয় তবে যেন সুবিচার পায়। বন্ধু উপাচার্য হাসতে হাসতে বললেন, কী করব আমি, অনেক বড় বড় জায়গা থেকে তদ্বির আসছে। বুঝলাম, এখানে আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের ভূমিকা থাকবে না!

বাম রাজনীতি করা আমার এক স্নেহভাজন সহকর্মী সেদিন বলছিলেন, সবটাই তো একটি প্যাকেজ স্যার। নির্বাচনী বোর্ড গঠনের শুরু থেকেই চক্রের কাজ শুরু হয়। উপাচার্য ও তার পরামর্শকরা মিলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকদের নিয়ে নির্বাচনী বোর্ড গঠন করেন, যা পরে যথাযথ কমিটির মাধ্যমে পাস করিয়ে নেয়া হয়। তারা প্রথমেই নিশ্চিত হন কমিটিভুক্ত শিক্ষকরা অভিন্ন রাজনীতি করা অভিন্ন মতের মানুষ কিনা।

দলীয় সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেবেন কিনা। এ কারণে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কদাচিৎ কোনো প্রার্থীর ভাগ্যের চাকা ঘোরে। তবে সবকিছু এতটা নষ্ট হয়ে গেছে আমি এমন করে ভাবতে চাই না। তাই আমার সহকর্মীর সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত করি। সহকর্মী এবার মোক্ষম জায়গায় ঘা মারলেন। বললেন, স্যার আপনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করান। তেত্রিশ বছর পার করে দিচ্ছেন শিক্ষকতায়।

আপনাকে আমরা নিবেদিত শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে জানি। কিন্তু এই তেত্রিশ বছরে আপনি নিজের বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য হননি। আপনার অযোগ্যতাটি হচ্ছে আপনি শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। আপনি গুণ দেখে বিচার করবেন। তাই কোনো উপাচার্য বা তার দল নিশ্চিন্ত হতে পারবেন না আপনাকে কমিটিতে রেখে। এসবের ব্যতিক্রম যে কখনও হয় না এমন নয়। তবে তা তেমনভাবে দৃশ্যমান থাকে না।
আমি ভাবি অন্য কথা।

এমন সব হতাশার কথা শুনে পাঠক না অহেতুক বেশি হতাশ হয়ে পড়েন। রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে শুধু অযোগ্যরাই শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন তেমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হতে গেলে ন্যূনতম কিছু যোগ্যতা পূরণ করেই আবেদন করতে হয়। সে হিসেবে সবাই কম-বেশি যোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, অধিকতর যোগ্য যখন তদ্বিরকারীদের দাপটের কারণে ছিটকে পড়ে তখন আমরা আসলে অনেক কিছুই হারাই।

একেবারে দলীয় ইচ্ছেতেই যে সব হয়ে যায় তেমন নয়। অনেক সময় নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যরা দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীর পক্ষে রায় দিতে চান। কিন্তু নানা বাধ্যবাধকতায় কখনও উপাচার্যের অনুরোধ তাদের রাখতে হয়।

এ ক্ষেত্রে এখনকার উপাচার্য মহোদয়রাও যে ভালো থাকতে পারেন তেমন নয়। যেহেতু তাকেও একই পথে কারও স্নেহের পরশ নিয়ে উপাচার্য হতে হয়েছে, তাই নিয়োগকর্তা বা নিয়োগকারী দলীয় নেতাদের কথাও তিনি না শুনে পারেন না। কিন্তু যোগফলে নিরীহ নির্ভেজাল মেধাবী প্রার্থীর গলাই গিলোটিনে কাটা পড়ে।

আমরা দায়িত্বশীলরা যদি এটুকু তদ্বির করতে পারতাম যে, ‘যোগ্য হলে প্রার্থী যেন ন্যায়বিচার পায়’, তবে অনেক অন্যায় থেকেই আমরা মুক্ত হতে পারতাম। প্রায়ই শোনা যায়- চাকরির ক্ষেত্রে মন্ত্রী কোটা, এমপি কোটা নামে অদৃশ্য কোটা থাকে। জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় বলেন, আমার এলাকার মানুষের জন্য তো আমাকে তদ্বির করতেই হবে। এটি অতি সত্য কথা। কিন্তু এই তদ্বিরের তোড়ে যে অনেক বেশি যোগ্য প্রার্থী কোথাও জায়গা পাচ্ছে না, এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার কে করবে? একটি শক্তিশালী তদ্বির যে দশজন যোগ্য প্রার্থীর সর্বনাশ করছে, এটি কি আমরা অস্বীকার করতে পারি? এলাকার মানুষের জন্য যেমন দায় থাকে, দেশের প্রত্যেক মানুষের বেলায়ও একই রকম দায় থাকার কথা।

আমাদের নীতিনির্ধারকরা ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ বিবেচনার বাইরে এসে যদি মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারেন, তাহলে ধ্বংসের দিকে চলে যাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো। গড়পড়তা বিচারে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান অধোগতির দিকে। নষ্ট শিক্ষক রাজনীতির পথ ধরে হাঁটতে থাকা অনেক শিক্ষক এখন ক্লাসে যাওয়া আর গবেষণায় যুক্ত থাকার চেয়ে দলীয় বৃত্তে বেশি ব্যস্ত থাকেন। নানা বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হওয়ায় নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের ঘাটতি বাড়ছে দিন দিন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা আমরা দায়িত্বশীলরা ভাবছি না।

উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য নানা পরিকল্পনার কথা শুনি। মানের মাপকাঠিতে স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশনের কথাও ভাবা হচ্ছে। এসবই ভালো ভাবনা। কিন্তু মূলে অশুদ্ধতা রেখে এই ভাবনা কি কাজে আসবে? আমাদের সরকার পরিচালকদের আগে সিদ্ধান্তে আসতে হবে উচ্চশিক্ষাকে তারা ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে চান কিনা। উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানের দিকে এগিয়ে নেয়ার সদিচ্ছা আছে কিনা। যদি তেমন ইচ্ছে থাকে তবে নষ্ট দলীয় বৃত্ত থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মুক্তি দিন। শিক্ষা গবেষণার পরিবেশ তৈরির জন্য যোগ্য মানুষদের পদচারণার সুযোগ তৈরি করুন। যোগ্য মানুষের নেতৃত্ব ছাড়া সুন্দর প্রত্যাশা করা যায় না। আমরা আমাদের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই। যোগ্য পণ্ডিত বিদগ্ধ মানুষের নেতৃত্ব ছিল এক সময় এসব প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উজ্জ্বল অবস্থানও তখন দৃশ্যমান ছিল। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের ধারাবাহিকতায় একই ইতিহাস স্মরণ করতে পারি। এখন যে খুব অযোগ্য মানুষরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তেমন নয়। কিন্তু তারা অনেক সময়ই রাজনীতির ঘেরাটোপে বন্দি থেকে মুক্ত মানুষ হতে পারছেন না। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর মুক্তচিন্তা বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে নিজ অহংকার ধরে রাখতে পারছে না।

ঠিক এমন এক সংকটাপন্ন দশায় যদি শিক্ষক নিয়োগের মতো জরুরি জায়গাটি তদ্বিরকারী মহাত্মনদের কব্জায় আটকা পড়ে তবে একদিকে প্রতিযোগিতার পথ ধরে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী হতাশায় নিমজ্জিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতি। এমন অসুস্থ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমি ক্ষমতাশালী তদ্বিরকারী বিশিষ্টজনদের বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করব।

ড. একেএম শাহনাওয়াজ
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম