[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



স্বপ্ন থেকে স্বপ্নান্তরে


প্রকাশিত: November 1, 2016 , 3:40 pm | বিভাগ: ফিচার


Drime

আব্বু আব্বু বলে মেয়েটি ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠে। মা তার পাশেই শুয়েছিলো। তিনি বললেন, মা মা কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছিস? মেয়েটি ঘুম থেকে উঠে বললো আব্বুকে স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নের ভেতর সুন্দর একটি দৃশ্য দেখলাম সেখান থেকে ভেসে আসছে সুললিত কণ্ঠে স্বর্গীয় অনুভূতির মনোরম আভাস।

কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আব্বুকে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, “কেমন আছিস মা? তোর আম্মু কেমন আছে”? আমি বললাম, আমি আর আম্মু আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। আমি প্রশ্ন করার আগেই আব্বু বললেন, মা খুব সাবধানে থাকিস। এই কথা বলেই আব্বু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

মেয়েটি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, আম্মু কেন আমাদের এই অবস্থা? আমরা তো আগে খুব সুখে শান্তিতে ছিলাম, আমাদের তো কোন অভাব ছিলো না। আম্মু ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। মা ও মেয়ের কান্না রাতের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যায় অন্তহীন গতির দিকে।

মেয়েটির নাম তানিয়া তাবাসসুম। পরীর মতো দেখতে। আয়তলোচনা চোখ। গোলাপ রাঙা কপোল। বাবা মার একমাত্র সন্তান। পরিবারে অতি আদরের। পরিবারের আশা মেয়েটি একজন ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

বাবা কাজী তারিকুজ্জামান। একজন মধ্যম আয়ের ব্যবসায়ী। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় আইডিবি ভবনে রয়েছে ইলেকট্রিকস দোকান। পরিবারসহ ভাড়া থাকেন এলাকার এক অফিসার্স কোয়ার্টারে। একমাত্র মেয়েটিকে ভর্তি করান এলাকার এক সনামধন্য স্কুলে। সুখে শান্তিতে ভালোই চলছিলো তাদের সংসার।

কিন্তু হঠাৎ, অকালেই হার্ট এটাকে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিস্তব্ধ পরিবার। দেখার কেউ নেই। জমানো টাকাও ইতোমধ্যে শেষ। পরিবারের দায়িত্বভার কাঁধে নিলেন মা।

মা সিদ্ধান্ত নিলেন, মেয়েকে নিয়ে চলে যাবেন গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। সেখানে রয়েছে নিজের টাকায় কেনা কাজী তারিকুজ্জামানের তিন একর জমি। যা এতোকাল ভোগ করে আসছিলো তার আপন ভাইয়েরা। গ্রামের বাড়ি গিয়ে আশাহত হলেন মা রেহেনা বেগম। জমি তো ফেরত পেলেনই না, বরং নানা ধরণের মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হলো। অবৈধভাবে সম্পত্তি দখলের নেশায় বিভোর বাড়ির সদস্যরা। নানা অশান্তির যবনিকা ঘটিয়ে ঢাকায় ফিরে এলেন মা ও মেয়ে।

কাজ খুঁজতে থাকেন রেহেনা বেগম। অবশেষে পেয়েও যান। আদাবরে এক বেসরকারি অফিসে রান্নার কাজ। অফিসের চিলেকোঠায় এক রুমে মা ও মেয়ের থাকার বন্দোবস্ত করেন বড় কর্মকর্তা। তাবাসুমকে ভর্তি করানো হয় আদাবরের এক স্কুলে। ভর্তি হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে।
মায়ের স্বল্প উপার্জনে কোনরকমে তার পড়াশোনা ও সংসার চলে। পড়ানোর জন্য আলাদা কোন শিক্ষক ছিলোনা। নিজেই কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে যায় তাবাসসুম। এভাবেই কাটতে থাকে দিন। অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৪.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়।

একদিন ক্লাস থেকে ফিরে- ‘আম্মু আম্মু শুনেছ, আমার বান্ধবী অন্তরা আছে না, সে বললো তাদের বাসার পাশে এক শিক্ষক আছেন উনি সুবিধাবঞ্চিত অভাবগ্রস্থ শীক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ান। চলো একদিন উনার কাছে গিয়ে আমাদের ব্যপারে বলি। তিনি নিশ্চয় সদয় হবেন’।
স্যার, সাদমান সাদিক। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্রকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। আদাবরে একটা ছোট রুম ভাড়া নিয়ে সেখানেই তিনি এবং তার বন্ধুরা সুবিধাবঞ্চিত শীক্ষার্থীদের পাঠদান করেন।

স্কুলে গিয়ে তাবাসসুম তার বান্ধবী অন্তরাকে বলে, আমি তো স্যারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে পড়াবেন। অন্তরা বললো তাহলে তো খুব মজা হবে, আমরা একসাথে পড়বো।
সাদমান স্যারের ক্লাসে মোট ছাত্রছাত্রী ১৫ জন, যাদের সবাই অভাবগ্রস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত। তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তকই পড়ান না পাশাপাশি কিভাবে ভালো মানুষ হওয়া যায় তার পরামর্শ দেন। একদিন ক্লাসে তিনি বলেন,

“ আমরা মানুষ এটিই আমাদের মূল পরিচয়। মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। তোমাদের শরীরে যেমন লাল রক্ত প্রবাহিত হয়, আমাদের শরীরেও একই রক্ত প্রবাহিত হয়। তোমাদের সকলকেই দেশপ্রেমিক হতে হবে। দেশপ্রেমের জায়গায় আমরা সকলেই এক এবং অভিন্ন, একই সত্তার অধিকারী”।

স্যার বললেন, ফারহান তুমি দাঁড়াও বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত দেশপ্রেমিক নাগরিকের নাম বলো। সে বললো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্যার বললেন ধন্যবাদ। দেশ ভাগের আগে যখন পাকিস্তান ছিলো তখন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান, বঙ্গবন্ধুকে সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন- “ বাবা রাজনীতি করো আপত্তি করবনা, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটি কথা মনে রেখ, ‘Sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না”।

স্যার বললেন, আমাদের নিয়মিত পড়াশুনা করতে হবে। তোমরা যে কাজ করবে তাতে যদি আন্তরিকতা ও সততা থাকে তাহলে জয় তোমাদের নিশ্চিত। দার্শনিক স্ট্যানলি হ্যাল এর নাম শুনেছ? তিনি বলেছেন, “If you learn your child 3R- Reading, writing, arithmetic and leave the fourth R. Religion, you will get fifth R Rascality”. “আপনি আপনার সন্তানকে যদি লিখন, পড়ন ও গণিত শিক্ষা দেন কিন্তু তাকে যদি ধর্ম শিক্ষা না দেন তাহলে আপনি একজন বদমাশ পাবেন”।

সাদমান স্যার বললেন আমরা কি বদমাশ হতে চাই? শীক্ষার্থীরা সমস্বরে বললো না। সেজন্য আমাদের পড়াশুনার পাশাপাশি স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে হবে। তাহলে ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুখী হতে পারবো। আজ এই পর্যন্তই।

তাবাসসুমের বাসার বিপরীত পাশে নিজস্ব ফ্ল্যাট বাসায় থাকেন বিশিষ্ঠ কর্পোরেট ব্যবসায়ী আনিস খান, তার স্ত্রী ও তাদের অতি আদরের নষ্ট পুত্র রকি ওরফে রকস খান। আনিস খানের ঢাকায় রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট ও পরিবারে সবার জন্য রয়েছে আলাদা আলদা গাড়ি। কোন কিছুর অভাব ছিলো না তাদের। অভাব ছিলো সুখ, স্নেহ, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সম্মান বোধের।

রকস খানের কু নজর পড়ে তাবাসসুমের উপর। স্কুলে ও স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার সময় প্রায় তাকে উত্ত্যোক্ত করে ও প্রেম নিবেদন করে রকস। তাবসসুম তাতে সাড়া দেয় না। সে এই ঘটনাগুলো তার আম্মুকে বলে। পরদিন রেহেনা বেগম আনিস খানের বাসায় গিয়ে তার ছেলের ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে, আনিস খান কোন কর্ণপাত করেন না।
এদিকে রকসের উত্ত্যোক্তের পরিধি বাড়তেই থাকে। উপায় না পেয়ে তাবাসসুমকে নিয়ে তার মা সাদমান স্যারকে ঘটনা বর্ণনা করেন। উত্তরে তিনি রকসের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।

পরদিন গলির পাশেই রকসের দেখা পেয়ে যান স্যার। আপনি কি রকস? হ্যাঁ, কি চাই? আপনি তাবাসসুমকে নাকি প্রতিনিয়ত উত্যোক্ত করেন? নির্লজ্জের মতো সে বলে করি, তাতে আপনার কি? আপনি কি তার বয়ফ্রেন্ড লাগেন? স্যার রাগ ধরে না রাখতে পেরে কষে রকসের গালে এক থাপ্পড় দিয়ে বলেন, আমি তাবাসসুমের স্যার। রকস বলে, আমি আপনাকে দেখে নিব।

এদিকে রকস গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে যে ভাবেই হোক প্রতিশোধ নিতে হবে। সে অন্যন্য বখাটেদের সাথে নিয়ে স্যার বাসায় যাওয়ার পথে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রচণ্ড মাথায় আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সাদমান স্যার। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এলাকার লোকজনের সহযোগীতায় হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা যান তিনি। রকস ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে পুলিশ।

তাবাসসুমের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। গোল্ডের জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। আজ তার স্যারের কথা আজ খুবই মনে পড়ছে। স্যার থাকলে কতোই না খুশি হতেন। না তাকে শুধু ভালো রেজাল্ট করলেই হবে না পরিবার ও স্যারের স্বপ্ন অনুযায়ী তাকে ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

আজ তাবাসসুমের মনে পড়ছে স্যারের সেই স্বপ্নের কথা, যেটা ক্লাসে কবিতার মাধ্যমে বলেছিলেন তিনি…

“ জীবনে আঁকেবাঁকে চলতে গিয়ে হঠাৎ তাদের সাথে দেখা
কোন এক অজানা আকর্ষণে বারবার ফিরে আসা
আমি ধরে নিয়েছি এরই নাম ভালোবাসা।
আমাদের সমাজে এমনও মানুষ আছে যারা দুঃখ বেদনায় কাতরাচ্ছে,
তাদের প্রতি নেই কারো সহানুভূতি, ভালোবাসা-তবে কি মানবতা ঘুমাচ্ছে?
কোথায় সেই সোনালী অতীত, যেখানে ছিলো ভালোবাসা স্নেহ অফুরান
ছিলো মানুষের প্রতি মানুষের দরদ ভরা প্রাণ,
ছিলো না হিংসা বিদ্বেষ খুনাখুনি
দেশটা ছিলো ভালো মানুষের খনি।
আমি হতে চাই সেই মানুষের একজন
যাদের ভালোবাসা, আত্বত্যাগ মানুষের তরে অম্লান।

লেখক: এস. এম. ওবায়দুল হক
মাস্টার্স, বায়োক্যামিস্ট্রি (অধ্যায়নরত)
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)
ঢাকা, ১ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// আইএইচ