[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সাদ হত্যা: ঘৃণিত ছেলের জবানবন্দি


প্রকাশিত: August 14, 2014 , 2:34 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,ক্যাম্পাস,পাবলিক ইউনিভার্সিটি,মত


তমাল তালুকদার: আমি এই সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। আমার থেকে একটা কুকুরও এই সমাজে অনেক সমাদর পেয়ে থাকে। বাড়ির খাবারে ভাগ বসাতে গেলে লোকজন হয়তো কুকুরকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ডাস্টবিনে ফেলা, উচ্ছিষ্ট ড্রেনে ফেলা খাবারের জগতে সে পুরো স্বাধীন। কিন্তু আমার যে সেখানেও কোনো স্বাধীনতা নেই। সেখানে গেলেও পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আমাকে মারার জন্য উদ্ধত হয়। নিজের জীবনকে বাঁচানোর জন্য আমি পাগলা কুকুরের মতো দৌঁড় দিই। কখনো রেহাই পাই, কখনো পাই না।

যখন পাই না তখন আমার হাত-মুখ-ঠোঁট রক্তে একাকার হয়ে যায়। আমি তারপরেও হাঁটতে থাকি দেশ-দেশান্তরে। এই হাঁটার মধ্যে শুকিয়ে যায় আমার রক্ত, আমার শরীরে যত ক্ষত আছে সব। আমার এই করুণ পরিণতির জন্য আমি মোটেই অনুতপ্ত নই। কারণ এই পরিণতির জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। শুধুই আমি। আর কেউ নয়। মাঝে মাঝে আমি চিন্তা করি, একটি বার শুধুমাত্র একটি বার আমি যদি ফিরে আসার চেষ্টা করতাম? আমার রুমমেট একরাম ভাই, আমার ফ্রেন্ড সবাইতো আমাকে অনেক বুঝিয়েছিল। কিন্তু আমিই তো ওদের কথা শুনিনি। দোষটা তো আমারই।

সেদিন আমাদের ক্যাম্পাসের সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে “বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ” একটা কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আমাদের ক্যাম্পাসের ফার্স্ট ইয়ারের মোটামুটি সবাই এতে অংশগ্রহণ করে। আমিও অংশগ্রহণ করি। আর সবচেয়ে অবাক করার বিষয়- ঐ প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম স্থান অর্জন করি। যখনই শুনলাম আমি প্রথম হয়েছি আমার ভেতরটা কেমন যেন ধপাস করে উঠল। মনের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসল আনন্দের উল্লাস।

এই ঘটনার পর ক্লাসের অনেকেই বাধ্য হয়ে আমার সাথে বন্ধুত্ব শুরু করল। আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও। এর কিছু দিন পরেই ছিল আমাদের ফ্যাকাল্টির প্রোগ্রাম। আমরা পাঁচ ছয় জন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম আমরা একটা কমেডি নাটক করব। যেই কথা সেই কাজ। জোরে শোরে শুরু হল রিহার্সেল। অনুষ্ঠানের দিন স্থানীয় এমপিসহ উপস্থিত ছিলেন ভিসি স্যার, প্রক্টর স্যারসহ অন্যান্য টিচাররা। আর ক্যাম্পাসের স্টুডেন্টরা তো আছেই। আমাদের প্রেজেন্টেশন দেখা সবাই পুরোপুরি অভিভূত হয়ে গেল। হাত তালিতে ভরে গেল পুরো অডিটোরিয়াম। ভিসি স্যার আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, “ছেলেটা নিশ্চিত খুব ভালো করবে।” এভাবেই চলতে লাগল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। তারপর একদিন আমাদের প্রথম সেমিস্টারের রেজাল্ট দেয়। রেজাল্টটাও খারাপ ছিল না- cgpa 3.80, মেধা তালিকায় চতুর্থ। অর্থাৎ অনেক প্রতিভা আর গতিময়তার সাথে চলতে লাগল আমার
সোনালী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত।

তারপর.. তারপর একদিন আমি রুমে বসে আছি এমন সময় হলের দুইজন বড়ভাই আসল আমার
রুমে। দুইজনেরই চেহারা কেমন যেন মাস্তান টাইপের। মাথায় লম্বা লম্বা চুল, মুখে ছাপ দাঁড়ি, আর চোখে কালো রঙের চশমা। তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, “কী খবর তোমার? পড়াশুনা কেমন চলছে?”
আমি স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিলাম, “ভালো ভাইয়া।” “ভেরি গুড। তোমার নামটা জানি কি?”
“আমার নাম তমাল। তমাল তালুকদার।”
“দেশের বাড়ি?”
“সৈয়দপুর।”
“তোমার বাড়ি সৈয়দপুর! আরে আমার বাড়িও তো সৈয়দপুর।” অপর ভাইয়াটা বলল। আমিও খানিকটা অবাক হলাম। কারণ এই ক্যাম্পাসে এর আগে সৈয়দপুরের কারো সাথে আমি পরিচিত হয়নি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম সৈয়দপুরের একমাত্র আমিই এই ক্যাম্পাসে আছি। আমি বললাম, “তাই নাকি ভাইয়া! তো কত নাম্বার রুমে থাকেন আপনি?”
“২০৫ নাম্বার এ। সন্ধ্যার দিকে একবার এসো। কথা আছে তোমার সাথে।”
“ঠিক আছে ভাইয়া।”উনারা চলে গেলেন।
সন্ধ্যার পরে আমি ভাইয়ার রুমে গেলাম। দেখলাম উনি একাই একটা রুম নিয়ে থাকেন। আমি ভেতরে ঢুকলাম।
“ও তমাল, আরে বসো বসো।” আমি বসলাম।
“ভাইয়া রুমে কি আপনি একাই থাকেন?”
ভাইয়া মুচকি হেসে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ রে, একাই থাকি।”
“আচ্ছা ভাইয়া আপনার নামটা কিন্তু এখনো জানলাম না।”
“ও, আমার নাম ফারুক। এই হলে সবাই আমাকে মেজো ভাই বলে চিনে।”
“ও, তাহলে আপনিই সেই মেজো ভাই। দেখুন তো অবস্থা, আপনার কথা কত শুনেছি
কিন্তু আপনিই যে মেজো ভাই তা তো একদম ধরতে পারিনি।”
“আমার সম্পর্কে আবার কী শুনলে?”
“আপনি নাকি অনেক বড় নেতা। সামনে নাকি আপনার ফ্যাকাল্টির ভি.পি ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছেন?”
“ভালোইতো জানো দেখছি। তো তমাল, ফিউচারে কি হওয়ার ইচ্ছা তোমার?”
“এই ক্যাম্পাসের টিচার হতে পারলেই আমি খুশি।”
“সেজন্য তো খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে তমাল।”
“সেটা ভাইয়া মোটামুটি আছে। লাস্ট সেমিস্টারে আমি ফোর্থ হয়েছিলাম।”
“ওরে ব্বা, সৈয়দপুরের ছেলেটা তো দেখছি খুব মেধাবী।”
আরো কিছু কথাবার্তার পর আমি ফারুক ভাইয়ের রুম থেকে চলে আসি। এরপর কারণে অকারণে প্রায় সময়ই ফারুক ভাই আমাকে ডাকতেন। আমিও যেতাম। আর নিজের এলাকার লোক হিসেবে ফারুক ভাইয়ের সাথে গল্প গুজব করতে ভালোই লাগত। ফারুক ভাইয়ের খুব সুন্দর একটা মোটর সাইকেল আছে। মোটর সাইকেলটা দেখে মাঝে মাঝে আমার খুব আফসোস হতো- ইস, যদি আমারও এরকম একটা থাকতো। কিন্তু এই আফসোসটা কেন যেন লোভে পরিণত হয়ে যায়। একদিন ফারুক ভাইকে বলেই ফেললাম, “ভাই, আমি মোটর সাইকেল চালানো শিখব।” ফারুক ভাই আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, “সৈয়দপুরের ছেলে, তুমি মোটর সাইকেল চালাতে পারো না, এ তো বড় লজ্জার বিষয়। চলো এখন থেকেই তোমার ট্রেনিং শুরু করি।” পাঁচ দিনের মাথায় আমি মোটর সাইকেল চালানো শিখে যাই। তারপর ফারুক ভাইয়ের মোটর সাইকেল নিয়ে আমি যখন ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে চষে বেড়াতাম।

আস্তে আস্তে দেখলাম ফারুক ভাইসহ উনার আশেপাশের সবার সাথে আমার কেমন যেন একটা বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। অনেকটা আপনজনের মতো। মাঝে মাঝে ফারুক ভাই আমাকে উনাদের পার্টি অফিসে নিয়ে যান। আমিও যাই। এক পর্যায়ে আমি বুঝতে পারি ওদের সাথে যুক্ত থাকাটা আমার পার্সোনাল ক্যারিয়ারের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যতই আমি ভালো রেজাল্ট করি না কেন এখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার হতে গেলেও
১০-১২ লাখ টাকার ঘুষ দিতে হয়, হোক তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নয়তো কোনো শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনকে। ফারুক ভাইদের দল যেহেতু এখন ক্ষমতায় আছে তাই অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম উনাদের সাথেই থাকি।
ফারুক ভাইদের সাথে মিশতে মিশতে আমার ক্লাসের বন্ধুদের থেকে আমি ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। বিষয়টা আমি দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যেতে থাকি সুকৌশলে। আমি হয়ে যাই মারাত্মক রকম স্বার্থপর। এভাবে এক অন্ধকার জগতের দিকে আমি নিজেই বাড়িয়ে দিই আমার হাত দুটো।

তারপর একদিন হলে একটা ছেলেকে মারা ফারুক ভাইয়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। মারা বলতে একেবারে প্রাণে মারা নয়। যাতে সপ্তাহখানেক একটু বিছানায় থাকে সেই ব্যবস্থা করা। ছেলেটা নাকি ফারুক ভাইয়ের অনেক ক্ষতি করেছে। তবে কি ক্ষতি সেটা আমি অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারিনি। ফারুক ভাইয়ের প্রতি এতদিনের ভালো সম্পর্কের কাছে আমি হেরে গেলাম মুহূর্তের মধ্যে। আমি বাধ্য হলাম হাতে অস্ত্র তুলে নিতে। এটাকে আমি একপ্রকার দায়িত্ব মনে করলাম- আমার ক্যারিয়ারের জন্য। হলের ২০৫ নাম্বার রুম এ ছেলেটাকে ডেকে এনে দেদারসে মারতে লাগলাম ফারুক ভাই, আমিসহ আরো ১০-১২টা ছেলে। মারতে মারতে ছেলেটা যে একেবারে প্রাণেই মারা যাবে তা আমরা কল্পনাও করিনি। কিন্তু ছেলেটা মারাই গেল।

এরপর ঘটে যায় নানান ঘটনা। এটাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে আন্দোলন হয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিলে আন্দোলন করে ক্যাম্পাসে। ফাঁস হয়ে যায় আসল ঘটনা। আমাকেসহ আরো দুইজনকে এক পর্যায়ে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু ফারুক ভাইসহ অন্য যারা আমার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল, আরো যারা আমার সাথে ছিল
তারা সবাই বেঁচে গেল। আমি হলাম বলির পাঠা। আস্তে আস্তে ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাসের প্রতিটি স্টুডেন্ট, টিচার, পরিবার, আত্মীয় স্বজন সবার কাছ থেকে ঘৃণিত হতে হতে আজ আমি এই পর্যায়ে আছি। জানি, উপরের কাহিনীটা শোনার পর আপনারা কেউই আমার ভালো চাইবেন না। ভালো চাইবেনই বা কেন? আমি তো আমার কৃত কর্মের জন্য মোটেই অনুতপ্ত নই। আমি স্বজ্ঞানে, স্বইচ্ছায় ওদের সাথে মিশেছি। আমি খুন করেছি সেটাও স্বজ্ঞানে, স্বইচ্ছায়। তাই বলছি আমার জন্য আশীর্বাদ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল এই পৃথিবীটাকে আরো কিছুদিন শান্তিতে দেখতে দিন। প্লিজ, আমি যখন আপনাদের বাড়ির আশপাশ দিয়ে যাই আপনাদের বাচ্চাদের একটু সামলে রাখবেন।

ওরা যেন আমাকে দেখলেই তাড়া না করে। আমি এই পৃথিবীটাকে আরো কিছুদিন মনের মতো করে দেখতে চাই। সবাই ভালো থাকুন। এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ভালো থাকুক।

 

ধন্যবাদ।

ইতি
তমাল তালুকদার

ঢাকা, ১৪ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// জেএন